ভালোবাসার শক্তি

পর্ব:-১ (সিজন-২)


--আপনার মেয়েকে শেষ বারের মতো নোটিশ দেওয়া হচ্ছে, এরপর যদি কখনো আর এমন করে! তবে তাকে টিসি দিতে বাধ্য হবো। এর আগেও আপনার মেয়ে ২ছাত্রীকে গুরুতর আহত করেছে আমার মাথায় আসে না এতোটুকু মেয়ে কিভাবে এসব করে?(ম্যাডাম)
--ম্যাডাম, এবারের মতো মাফ করে দিন। আর কোনো দিন এমন করবে না। আমি কথা দিচ্ছি।(মামুন)
--ঠিক আছে, নিয়ে যান ওকে।
--ধন্যবাদ ম্যাডাম... চলো মা...

মামুন অনিমাকে নিয়ে বাসার দিকে রওয়ানা দিয়েছে। অনিমার বয়স মাত্র ৭ বছর, ২য় শ্রেনীতে পড়ে মেয়ের অপরাধের জন্য মামুনকে আজ স্কুলে ডাকা হয়েছে। মামুন অনিমাকে নিয়ে একটা পার্কে আসলো। অনিমা একটা বেঞ্চে বসে আইসক্রিম খাচ্ছে। মামুন ২ হাটু গেড়ে অনিমার সামনে বসলো।

--মা, কেনো তুমি এমন করো? টিচার তোমার বাবাকে বকে এটা দেখতে তোমার ভালো লাগে?
--না পাপা,, আমি কিছু করিনি তো।
--তাহলে টিচার আমাকে বকলো কেনো?
--টিচার ভালো না, তাই না পাপা?
--তুমি কেনো তোমার বন্ধুকে ধাক্কা দিয়েছো?
--না পাপা, আমি ধাক্কা দেই নি.. ও আমার পেন্সিলটা নিয়ে গেছিলো।
--তাই তুমি ধাক্কা দিবে?
--ধাক্কা দেইনি তো।
--তাহলে ও সিড়ি থেকে পড়লো কিভাবে?
--আমি ওর থেকে পেন্সিলটা চেয়েছিলাম, ও দিবেনা বলেছিলো। আমি শুধু বলেছিলাম পেন্সিল না দিলে সিড়ি থেকে পড়ে যাবে। আমি শুধু বলেছিলাম, কিন্তু ধাক্কা দেই নি।
--সত্যি তো?
--হ্যা পাপা, সত্যি
--ঘরে গিয়ে এসব আম্মুকে একদম বলবে না, তাহলে আম্মু বকবে।
--আচ্ছা।
--চলো
--আমার পা ব্যথা করছে, কোলে নাও
--আসো

মামুন মেয়েকে নিয়ে গাড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেয়। পর পর দুটো সিএসজি খালি চলে যায়, কিন্তু দাড়ায় না। ৩ নাম্বার সিএনজি ও ওভাবে চলে যাচ্ছে। মামুন নিজে নিজেই বলছিলো, খালি যাচ্ছে তাবুও নিবে না, ভাড়া দেবোনা নাকি? অনিমা বাবার মুখের দিকে চেয়ে আছে। হঠ্যাৎই একটা শব্দ মামুনের কানে আসে। সিএনজির চাকা ফেটে গেছে। মামুন অনিমার দিকে চেয়ে আছে। এই মেয়ে হয়তো মনে মনে কিছু বলেছে......

মামুন অনিমাকে নিয়ে ঘরে আসে।
টিং টং
প্রিয়া দরজা খোলে...
--আজ আবার এতো দেরি?(প্রিয়া)
বাবা মেয়ে একজন আরেক জনের দিকে চাওয়া চায়ি করছে।
--আজ গাড়ি পেতে দেরি হয়েছে।(মামুন)
অনিমা টুক করে হেসে দেয়।
--অনিমা, তোমার ড্রেস লাল হলো কিভাবে?
(অনিমা কিছু বলার আগেই মামুন ওর মুখ চেপে ধরে)
--আসলে এটা হচ্ছে রাস্তার ময়লা... কিভাবে যে লেগে গেলো....
--আজ আবার ওকে আইসক্রিম কিনে দিছেন?
--শুধু একটা... সত্যি।
--প্রতিদিন আইসক্রিম খেয়ে খেয়ে ড্রেস ময়লা করে,,, আপনি বুঝেন না?
--মাম্মা, আর খাবো না, পাপা কে বোকো না।(অনিমা)
--যাও, ঘরে যাও।
অনিমা পাপাকে টেনে ঘরে নিয়ে যায়, কেননা সে জানে, ওখানে থাকলে মাম্মা আরো বকবে।
--পাপা, আমি বলেছিলাম, আইসক্রিম খেলে মাম্মা বকবে, দেখেছো?(অনিমা)
--চিন্তা করো না মা, যাও, দাদুর কাছে যাও। পাপা গোসল করে নেই।
--আচ্ছা।

অনিমা কোনো সাধারন মেয়ে নয়। অনিমার মধ্যে এক ধরনের শক্তি আছে। সে রেগে গিয়ে যা বলে তাই হয়ে যায়। পরিবারের সবাই এটা জানে। কিন্তু অনিমা কাছে শুধু এই শক্তির নয়, আরো কিছু শক্তি আছে, যা পরে জানতে পারবেন। অনিমা তার পাপাকে খুব ভালোবাসে, তেমনি পাপাও অনিমাকে খুব ভালোবাসে।

--সত্যি করে বলুনতো, আজ আবার স্কুল থেকে ডেকেছে, তাই না?(প্রিয়া)
--(মামুন জুতো খোলায় মনোযোগী, চুপ করে আছে)
--আজ কি করেছে অনিমা?
--ও কিছু করেনি, ওকে কিছু বলবেনা একদম।
--তাহলে কেনো ডেকেছে স্কুল থেকে?
--(প্রিয়ার দুহাত ধরে ওর পাশে বাসায়) তুমিতো জানোই, অনিমা মনে মনে কিছু বললে সেটা হয়ে যায়, ওর কি দোষ?
--জানি না এটা কেমন ক্ষমতা,, না জানি কোন দিন এই ক্ষমতার জন্য কোন বিপদে পড়তে হয়।
--তুমি চিন্তা করো না, সব ঠিক হয়ে যাবে।
রাতে মামুন অনিমাকে ঘুম পাড়িয়ে দিচ্ছে।
--মা, তোমাকে একটা কথা বলি?
--বলো পাপা.
--তুমি কেনো তোমার বন্ধুদের বকো?
--আমি বন্ধুদের বকি নাতো, শুধু কাল একজনকে বকেছি।
--আচ্ছা মা, যদি আমি তোমার পেন্সিল নিয়ে নি, তাহলে তুমি আমাকেও সিড়ি থেকে পড়ে যাওয়ার কথা বলবে?
--কক্ষনো না, আমার পাপাকে আমি খুব ভালোবাসি। এমন কক্ষনো বলবো না
--শুধু পাপাকে না, এরকম কথা কাউকে বলবে না।
--আমাকে মারলেও বলবো না?
--না, এমন যারা বলে, তারা পাপার ভালো মেয়ে নয়।
--আমি আর কাউকে বলবো না, আমি পাপার ভালো মেয়ে।(আনিমা পাপাকে জড়িয়ে ধরে আছে)
--এইতো আমার লক্ষি মেয়ে। যদি কখনো কাউকে কিছু বলো, তবে ভালো কথা বলবে, তা না হলে কিচ্ছু বলবে না। কেমন?
--আচ্ছা পাপা।
--যদি আর কখনো টিচার পাপাকে স্কুলে ডেকে বিচার দেয়, তাহলে পাপা আর অনিমার সঙ্গে কথা বলবে না।
--আর কক্ষনো ডাকবে না।
--এবার ঘুমাও, সকালে স্কুল আছে না.....

খুব ভালোভাবেই দিন গুলো যাচ্ছে, মামুনকে আর মেয়ের নালিশ শুনতে হয় না। মামুন, প্রিয়া, অনিমা, আয়েশা বেগম খুব সুন্দর একটা পরিবার। কিছুদিনের মধ্যে ঘরে আরো একজন অতিথির আগমন হয়। অনিমার একটা ছোট্ট ভাই হয়। নাম অয়ন..। অনিমা সারাদিন ভাইকে নিয়ে ব্যস্ত... কাউকে ছুতেও দেয় না। একেবারে অনিমার কলিজার টুকটা। অনিমা ধীরেধীরে বড় হচ্ছে। নিজেকে বুঝতে শিখছে.... ভালো খারাপ বুঝতে শিখছে।

পাপার একটা কথা অনিমা আজও মনে রেখেছে, কাউকে খারাপ কিছু বলা যাবে না। বলতে হলে ভালো কিছু বলতে হবে। অনিমা তাই করে। নাহলে যে পাপা কথা বলবেনা বলেছে। একবার আয়েশা বেগম ভীষন অসুস্থ হয়ে পড়ে। যত ডাক্তার দেখায়, কোনো কাজ হয় না। শেষে কোনো উপায় না পেয়ে একজন কবিরাজকে ডাকা হয়। এই কবিরাজকে ডাকাই ছিলো মামুনের জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল সিদ্বান্ত।

কবিরাজ ঘরে পা রেখেই অনিমাকে লক্ষ্য করে। কবিরাজ মামুনকে একটা অফার দেয়, যদি মাকে বাঁচাতে হয়, তবে মেয়েকে বিসর্জন দিতে হবে। অর্থাৎ অনিমাকে মরতে হবে। মামুনের মাথায় যেনো রক্ত উঠে গেলো। সে কবিরাজকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বাড়ি থেকে বের করে দেয়। যাওয়ার সময় কবিরাজ বলেছিলো, এর পরিনাম ভালো হবে না। প্রিয়ার তখনই অতীতের কথা মনে পড়ে যায়, কখনো যেনো অনিমাকে কোনো কবিরাজ বা তান্ত্রিককে না দেখানো হয়। এতেই তার মঙ্গল।

আজ কি তাহলে চরম ভুল হয়ে গেলো? প্রিয়া মেয়েকে নিয়ে চিন্তায় পড়ে যায়, কেনো মেয়েকে লুকিয়ে রাখলো না? এখন যদি কবিরাজ অনিমার কোনো ক্ষতি করে দেয়। মামুন এসবের কিছুই জানতো না।

এর কিছুদিন পরই আয়েশা বেগম প্রচন্ড অসুস্থ হয়ে মারা যান। এবং তার কিছুদিন পর অয়ন অসুস্থ হয়ে পড়ে। কোনো ডাক্তারই রোগ ধরতে পারছিলো না। প্রিয়া ভালো করেই বুঝতে পারে, এসব কবিরাজের কাজ। অন্য কোনো কবিরাজকেও ভয়ে ডাকতে পারছে না। ভাইয়ের এই অবস্থায় অনিমা কাঁদতে কাঁদতে শেষ। অনিমাও বুঝতে শিখেছে। সে পাপাকে বলে,

--পাপা, ভাইকে সুস্থ করতে হলে আমাকে মরতে হবে তাই না? আমি মরে যাবো, ভাই ভালো হয়ে যাক।
(মেয়ের এমন কথায় মামুনের কলিজা কেঁপে ওঠে)
--কি বলছো মা? কে বলেছে তোমাকে এসব?
--ওইদিন বুড়ো লোকটা বলে গেলো।
--ওই লোকটা ভালো না, ও মিথ্যে বলেছে।
--তাহলে ভাই ভালো হচ্ছে না কেনো?
--চিন্তা করো না মা, অয়ন ভালো হয়ে যাবে, আবার তোমার সাথে খেলবে।

বাবার বিশ্বস্ত কথায় অনিমা চোখের পানি মুছে ভাইয়ের কাছে গিয়ে বসে থাকে। পরের দিন সকালে সবার ঘুম ভাঙার পর কেউ অয়নকে আর দেখতে পায় না। হঠ্যাৎ করেই অয়ন উধাও। প্রিয়া হাউমাউ করে কাঁদতে থাকে। মামুন পুরো এলাকা খুজে, তবুও অয়নকে কোথাও খুজে পায় না, ৩বছরের বাচ্চা, ঘর ছেড়ে কোথায় যাবে?

প্রিয়া মামুনকে ধরে কাঁদছে, অনিমা দরজায় দাড়িয়ে আছে। দাদুর মৃত্যুর পর আবার বাবার চোখে পানি দেখলো অনিমা। প্রিয়া মামুনকে বলছে, সব ওই কবিরাজ করছে, কবিরাজই অয়নকে নিয়ে গেছে। অনিমা মায়ের মুখে কবিরাজের নাম শুনে। সন্ধ্যায় কবিরাজ নিজের হাতে অয়নকে ঘরে এনে দিয়ে যায়, অয়ন একদম সুস্থ।

কবিরাজ মামুন আর প্রিয়ার পায়ে পড়ে ক্ষমাও চায়। মামুন তার চোখে মুখে স্পষ্ট ভয় দেখতে পায় কিছু একটা হয়েছে, তা না হলে কেনো কবিরাজ এমন করবে? মামুন অনিমার দিকে ঘুরে তাকায়, সে কবিরাজের চলে যাওয়া দেখতেছে। অনিমার চোখে মুখে ক্ষোভ হঠ্যাৎ বাহিরে একটা বিকট শব্দ হয়, মামুন তাকিয়ে দেখে কবিরাজকে একটা ট্রাক চাপা দিয়ে চলে যাচ্ছে।

অনিমা এখনো ওদিকে এক নজরে তাকিয়ে আছে। কবিরাজ ওর কলিজায় হাত দিয়েছে, ওর বেচে থাকার কোনো অধিকার নেই। মামুন দৌড়ে অনিমার কাছে আসে। অনিমা এখনো কবিরাজের উদ্দেশ্যে বাহিরে তাকিয়ে আছে। মামুন অনিমাকে জোরে একটা ঝাকুনি দেয়, অনিমার হুস ফেরে।

--এসব তুমি করেছো?(মামুন)
--আমার ভাই কোথায়?(মামুনের কোনো উত্তর না দিয়ে দৌড়ে অয়নের কাছে চলে যায়)

মামুন আর প্রিয়া দুজনই অবাক হয়ে যায়। এটা অনিমাই করেছে, কোনো সন্দেহ নেই। আবার এর জন্য বড় কোনো মাসুল গুনতে হবে নাতো? মামুন রাতে অনিমাকে জিজ্ঞেস করে....

--মা, সত্যি করে একটা কথা বলবা?
--বলো পাপা...
-অয়নকে খুজে পাওয়ার ব্যাপারে তুমি মনে মনে কিছু বলেছো?
--হ্যা...
--কি বলেছো?
--বললাম, আল্লাহ, আমার ভাই কোথায় হারিয়ে গেছে, ওর জন্য পাপা কাঁদছে। ভাই যেনো ফিরে আসে...
--ওই বুড়ো আংকেলটাকে নিয়ে কিছু বলেছো?
--হুম, বলেছি উনি যদি ভাইকে নিয়ে গিয়ে থাকে তাহলে যেনো তাড়াতাড়ি ফেরত দিয়ে যায়।
--যখন অয়নকে ফেরত দিয়ে চলে যাচ্ছিলো তখন কি বলেছো?
--বলেছি ভাইকে চুরি করে অপরাধ করেছে, এর শাস্তি যেনো ও পায়।
--দেখো মা, তোমাকে একদিন বলেছিলাম, কখনো কাউকে খারাপ কিছু বলবে না, আর তুমি সেটাই করছো? কেনো?

--সরি পাপা, আর বলবো না, এইযে কানে ধরলাম।


লেখক :- আবদুল্লাহ আল মামুন

Post a Comment

Give your opinion, please!

নবীনতর পূর্বতন