ভালোবাসার শক্তি

পর্ব:- ১


--এতো রাতে এখানে কি করছেন? --(চুপ.....) --এই যে ম্যাডাম..... --আমার কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই। --মানে? --আমি বাড়ি থেকে পালিয়ে এসেছি। --কোথায় যাওয়ার উদ্দেশ্যে বেরিয়েছেন? --আমার কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই। --মহা বিপদ তো। এভাবে রাস্তায় থাকলে তো ওরা আবার আসবে। কি করবেন? --আমি জানি না। আমাকে আজ রাতটা থাকার জন্য কোথাও ব্যবস্থা করে দিবেন? সকাল হলেই আমি চলে যাবো। --এতো রাতে কোথায় পাবো এসব? --যদি পারেন এতটুকু সাহায্য করুন। --আপনি চোর, ডাকাত, বা কোনো আসামী নন তো? --কি যা তা বলছেন? --আমার বাড়ি যাবেন? --আপনার বাড়ি? --ভয় পাবেন না, বাড়িতে মা ও আছে। --(মেয়েটা চুপচাপ দাড়িয়ে রইলো) --চলুন আমার সাথে.... মেয়েটা ছেলেটার পিছু পিছু হাটছে।
ছেলেটা মামুন, এই ঠান্ডা আবহাওয়ায় কানে হেডফোন লগিয়ে পকেটে হাত দিয়ে হাটতে হাটতে গোধূলি রাতটা উপভোগ করছিলো। সারাদিনের অফিসের ক্লান্তি দুর করতে বাসায় যাওয়ার সময় এই কাজটি করতো মামুন। প্রতিদিনের মতোই একই গন্তব্যের দিকে এগুচ্ছিলো। ল্যাম্পপোস্টের আলো চারদিকের পরিবেশটা ভিন্নরকম ভাবে সাজিয়ে তুলেছে। হঠ্যাৎ চোখ পড়ে একটা ছায়ার দিকে। কাছে গিয়ে দেখলো একটা মেয়ে। কালো বোরকা পড়া, নিকাব করা... চোখ দেখে বোঝা যাচ্ছে যথেষ্ট সুন্দরী। মেয়েটা ল্যাম্পপোস্টের নিচে দাড়িয়ে আছে। এবং মেয়েটাকে কিছু বখাটে বিরক্ত করছিলো।তখনই মামুন মেয়েটার সামনে আসে। মামুনকে দেখে বখাটেগুলো চলে যায়, কারন মামুন এই এলাকারই ছেলে। ছোট-বড় প্রায় সবার সাথেই তার সুসম্পর্ক আছে।হয়তো বা সেই কারনেই ছেলেগুলো কোন কথা না বাড়িয়ে চলে যায়। টিং টং..... আয়েশা বেগম এসে দরজা খোলেন। মামুনের সাথে একটা মেয়ে, মেয়েটার হাতে একটা ব্যাগ। হঠ্যাৎই মিসেস আয়েশা অজ্ঞান...... দুজন ধরাধরি করে ওনাকে বিছানায় শোয়ালো। পানির ছিটা দিলে ওনার জ্ঞান ফিরে। চোখ খুলে উনি মামুনের দিকে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে। --কি হয়েছে তোমার? শরীর খারাপ? মিসেস আয়েশা বিছানা থেকে উঠেই মামুনকে ধোলাই শুরু করলো। --হতচ্ছারা, কি করলি এটা, আমাকে না জানিয়ে বিয়ে করলি, কত আশা ভরসা ছিলো একমাত্র ছেলের বিয়ে ধুমধাম করে দিবো। আর তুই কিনা সোজা বউ নিয়ে চলে আসলি? --আরে মা, এটা বউ না। --এখন আবার ভালো সাজা হচ্ছে?(জোরে কান টেনে ধরলো) --মা লাগছে লাগছে, ওমাগোওওওও --আগে বল আমাকে জানালিনা কেনো? (মেয়েটা পাশেই দাড়িয়ে আছে, এবং তার সামনে দিয়ে একটা ঘূর্ণিঝড় যাচ্ছে, সেদিকে হা করে তাকিয়ে রয়েছে।) --মা সত্যি বলছি, ওনাকে আমি চিনি না। --তাহলে এটা কে? --রাস্তায় বিপদে পড়েছে, তাই সাথে করে নিয়ে এলাম। --সত্যি তো? --বিশ্বাস না হলে ওনাকে জিজ্ঞেস করো! --ও কি সত্যি বলছে?(মেয়েটাকে বললো) --জ্বী --তোমার নিকাব খুলো, দেখি কে তুমি..। কিছুটা অসংকোচ করলেও মেয়েটা ধীরে ধীরে তার নিকাব খুললো.... মামুন এক পলকে তাকিয়ে আছে, এ যেনো এক অপ্সরী... এতো সুন্দরও বুঝি কেউ হয়? আয়েশা বেগম ও অবাক, খুবই মিষ্টি একটা মেয়ে। --যা, আজকের মতো মাফ করে দিলাম। এসো মা, আমার সাথে এসো।(আয়েশা বেগম) মিসেস আয়েশা মেয়েটাকে ওনার রুমে নিয়ে গেলেন। --কিছু খেয়েছো? --জ্বি না।(কথাটা বলতে মেয়েটার ঠোট কেঁপে উঠলো) আয়েশা বেগম বুঝতে পারলেন মেয়েটি অনেক ক্ষুধার্ত। প্রচন্ড মায়াবী একটা মেয়ে। আয়েশা বেগম নিজে নিজে ভাবছেন, ছেলের বিয়ের জন্য মেয়ে দেখতে দেখতে ক্লান্ত, কোনো মেয়েই ছেলের পছন্দ হয় না। ছেলে যদি মেয়েটাকে বিয়ে করেও নিয়ে আসতো, কোন আপত্তি থাকতো না। --চলো আমার সাথে। মেয়েটাকে নিয়ে খাবার টেবিলে বসালেন। --আগে খেয়ে নাও, পরে আমরা কথা বলবো। --আমি একটু হাত মুখ ধুয়ে আসি? --ও হ্যা, চলো.... এরপর মেয়েটি খাওয়া শুরু করলো। মামুন ও খেতে আসলো। --এটা কি হলো মা? আমাকে না ডেকে আজ খাওয়া শুরু করে দিলে? --চুপ চাপ খা, মেয়েটা পুরোদিন না খেয়ে আছে। --ওওওও মামুন আর মুখ খুললো না, ও জানে এখন আর কিছু বললেই আরেকটা ঘূর্ণিঝড় ওর পিঠের ওপর দিয়ে যাবে। খাওয়া শেষে মেয়েটাকে নিয়ে ওনার রুমে গেলেন। --তোমার নাম কি? --জ্বি আমার নাম প্রিয়া। --তুমি এতরাতে রাস্তায় কেনো? --আমি বাড়িথেকে পালিয়ে এসেছি। --কেনো কেনো? --আমার বাবা-মা নেই, ছোটবেলা থেকেই নানুর বাড়িতে বড় হয়েছি। কয়েকদিন আগে মামা আমার বিয়ে ঠিক করে। এতে আমার কোন আপত্তি ছিলো না। কৌতুহল বসত ছেলের ব্যাপারে জানার আগ্রহ হলো, তাই মামাতো ভাইকে দিয়ে ছেলের খোজ খবর নেই। আমার বিয়ে নাকি এক বড়লোকের ছেলের সাথে ঠিক হয়েছে। ছেলেটার একটা ছবি সংগ্রহ করি, ছেলেটার ছবি দেখে আমি তাকে চিনতে পারি, আমাদের এলাকার বখাটেদের মধ্যে একজন, ছেলেটা ছিলো নেশাখোর, এবং চরিত্রহীন। এছাড়াও অবৈধ কাজ করতো। এলাকার সবাই জানতো ছেলেটার ব্যাপারে। আমি মামাকে ছেলেটার ব্যাপারে বলি, মামার একটাই কথা, ওকেই বিয়ে করতে হবে। বুঝলাম মামা সব জেনে শুনেই আমার বিয়ে ওই ছেলেটার সাথে করাচ্ছে। হয়তো বা নিজের সার্থের জন্য আমাকে কোরবানি করতে চাচ্ছিলো। নানু ও কিছু বলতে পারছিলো না। তাই নানু আমাকে বাড়ি থেকে পালিয়ে যেতে বলে। কাল ফজরের আগে আগে ঘর থেকে বেরিয়ে যাই। এরপর সারাদিন রাস্তায় ছিলাম। রাত হয়ে যাওয়ায় রাস্তার একপাশে দাড়িয়ে ছিলাম। কিছু বখাটে আমাকে উত্যক্ত করছিলো, আপনার ছেলে আমাকে ওদের থেকে বাচিয়ে এখানে নিয়ে আসে। --খুব ভালো করেছো বিয়ে না করে। জেনে শুনে কেনই বা আগুনে পা বাড়াবে? তোমার আর কোন আত্মীয় নেই। --আছে, কিন্তু কারো সাথে যোগাযোগ নেই। বাবা মা মারা যাওয়ার পর কেউ আমার খোজ নেয়নি। এখন কোন ভরসায় তাদের কাছে যাবো? আয়েশা বেগম ও বুঝলেন মেয়েটা পুরোপুরি বিপদে পড়ে গেছে। তাই আর কথা বাড়ালেন না। মেয়েটাকে ওনার সাঙ্গেই রাখলেন। সকালে আয়েশা বেগম ঘুম থেকে উঠে দেখলেন মেয়েটা ওনার আগেই, নামাজে দাড়িয়ে গেছে। এটা দেখে ওনার ঠোটের এক কোনে হাসি ফুটে উঠলো। নামাজ পড়ে আয়েশা বেগম নাস্তা বানানোর জন্য পাকের ঘরে আসলেন। এসে দেখে প্রিয়া আগে থেকেই পাকের ঘরে আছে, এবং এদিক ওদিক জিনিসপত্র খুজতেছে। --কি খুজতেছো?? --নাস্তা বানানোর জিনিসপাতি খুজছি। --তুমি কেনো নাস্তা বানাবে? এটাতো আমার কাজ, তুমি আমার মেহমান। তুমি ঘরে যাও। --এটাতো আমি সবসময় করতাম। আমি ভালো নাস্তা বানাতে পারি, একদিন আমার বানানো নাস্তা খেয়েই দেখুননা, জানি না আর কখনো সুযোগ হবে কিনা। --তুমি একা পারবে না। --পারবো, আমাকে একটু দেখিয়ে দিন, কোথায় কি আছে। তাহলেই হবে।
আয়েশা বেগম মেয়েটাকে সব দেখিয়ে দিলো। মামুন আজ নাস্তায় অন্য একটা স্বাদ অনুভব করলো। --মা, আজ নাস্তা কে বানিয়েছে? --ও বানিয়েছে.... কেনো ভালো হয় নি? --হয়েছে.... কিন্তু তোমারটাই বেস্ট। --হয়েছে, আর পাম দিতে হবে না। মেয়েটা কত কষ্ট করে বানিয়েছে। কথা না বলে খা। --আজকের দুনিয়ায় ভালো কথার দাম নাই। আজকের নাস্তাটা খুব ভালো হয়েছে, এতোদিন কি না কি খাওয়াছো? কোন টেস্টই ছিলো না। --কি বললি? আমি ভালো বানাই নি? দাড়া.... মামুন প্লেট হাতে দৌড়ে রুমে চলে গেলো। প্রিয়া এসব দেখে হাসতেছে। --কিছু মনে করোনা মা, আমার ছেলেটা এমনই, ভীষণ দুষ্ট। --না না, আমি কিছু মনে করিনি। --আসলে আমাদের পরিবারে শুধু আমরা দুজনই। অনেক বছর হলো ওর বাবা মারা গেছে। তখন থেকেই আমরা দুজন, আমরা বন্ধুর মতোই। তাই আমার সাথেই বেশি দুষ্টমি করে। --হুম, আপনারা একটা সুখি পরিবার, কিন্তু আমার খুব হিংসে হচ্ছে, এমন একটা পরিবার যদি আমার হতো। আয়েশা বেগম মেয়েটার আবেগ বুঝতে পারলেন। মামুন যথাসময়ে ওর অফিসে চলে যায়। --আন্টি, আমাকে যে চলে যেতে হবে(প্রিয়া) --কোথায় যাবে?(আয়েশা বেগম) --জানিনা। --কোথাও যাওয়ার প্রয়োজন নেই। তুমি এখানেই থাকবে। --আমি আপনাদের বোঝা হতে চাই না। আমি কোথাও আমার ব্যবস্থা করে নিবো। --এখানে তোমার সমস্যা হচ্ছে? আমি কিন্তু ওতোটা খারাপ না। আমার ছেলেও খুব ভালো। --না না, আন্টি, তা নয়, আপনারা কেমন তা আমি ভালো করেই বুঝেছি। একটা ছেলে আমাকে চেনে না, তবুও রাস্তা থেকে এনে নিজের মায়ের কাছে রাখে, সেই মা ও আমাকে চিনে না, অথচ নিজের মেয়ের মতোই রাখলো। এই মানুষগুলো কোন ভাবেই খারাপ হতে পারে না। আমার সৌভাগ্য আমি আপনাদের দেখা পেয়েছি। কিন্তু এভাবে কতদিন? --সেটা আমার উপর ছেড়ে দাও, তুমি কোথাও যাচ্ছোনা। এবং আমার মেয়ে হয়েই এই বাড়ি থাকবে। প্রিয়ার চোখে পানি চলে আসে। প্রিয়া এই বাড়িতেই থাকা শুরু করে। সত্যিই প্রিয়া আজ প্রচন্ড খুশি। মায়ের ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত হয়েও আজ মা পেয়ে গেলো। এভাবে কয়েকদিন চলে যায়। মামুন শুধু সকাল সন্ধ্যা আর শুক্রবার বাসায় থাকতো। কিন্তু মায়ের ভয়ে প্রিয়ার সাথে তেমন একটা কথা বলতো না। প্রিয়াও তেমনই। প্রিয়ার রুপে, গুনে, মামুনকে আকৃষ্ট করে তোলে। একটা যুবতী মেয়ে যখন একই ঘরে থাকবে তখন একটা যুবকের নজর পড়তেই পারে। মামুন ধীরে ধীরে প্রিয়ার প্রতি দুর্বল হয়ে পড়ে। কিন্তু আত্মসম্মানের ভয়ে কখনো বলা হয় নি।কারন প্রিয়া এই পরিবারের ওপর বিশ্বাস করে, সেই বিশ্বাস কিছুতেই নষ্ট হতে দেওয়া যাবে না।তেমনি প্রিয়াও, পরিবারটা ওকে বিশ্বাস করে আশ্রয় দিয়েছে। সেই বিশ্বাস ও নষ্ট হতে দেওয়া যাবে না। একদিন আয়েশা বেগমের কানে একটা কথা আসে..... প্রতিবেশীরা বলাবলি করছিলো," একটা যুবতী মেয়েকে এনে বাড়িতে রেখেছে, যেই ঘরে তার যুবক ছেলে রয়েছে সেই ঘরে কোন সম্পর্কের জোরে অন্য একটা মেয়েকে এনে রেখেছে।" যার জন্য আয়েশা বেগম খুব বড় একটা ডিসিশন নিয়ে নেন.....

লেখক :- আবদুল্লাহ আল মামুন

2 মন্তব্যসমূহ

Give your opinion, please!

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Give your opinion, please!

নবীনতর পূর্বতন