ভালোবাসার শক্তি
পর্ব:- ২
প্রতিবেশীরদের এই ধরনের কথা শুনে আয়েশা বেগম খুব বড় একটা ডিসিশন নিয়ে নেন। রাতে প্রিয়ার সাথে আলাদাভাবে বসেন।
--শুনো মা, তোমার সাথে আমার একটা জরুরী কথা ছিলো।
--জ্বি বলুন না আন্টি।
--প্রতিবেশীরা নানান রকম কথা বলছে তোমাকে নিয়ে, কেনো একটা অপরিচিত মেয়েকে ঘরে রেখেছি।
--আমি শুনেছি আন্টি, আমি কালই চলে যাবো।
--তোমাকে যেতে কে বলেছে?
--এছাড়া লোকের মুখ বন্ধ করার কোনো উপায় নেই।
--আমাকে সারাজীবনের জন্য মা ডাকবে?
--(প্রিয়া প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে আয়েশা বেগমের দিকে তাকিয়ে আছে)
--তোমাকে আমি এই বাড়িতেই রেখে দিতে চাই। আমার ছেলের বউ হবে? যদি তুমি চাও তাহলে.......
আর কিছু বলার আগেই প্রিয়া হবু শাশুড়িকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে দেয়।
--এই মেয়ে, কাঁদছ কেনো?....... আরে কি হলো?
--খুব করে চাইতাম, আপনাদের সঙ্গে যদি সারাজীবন কাটিয়ে দিতে পারতাম।
--বোকা মেয়ে, এই জন্য কাঁদতে হয়? তোমার কোনো আপত্তি আছে আমার বউমা হতে?
--(ছোট বাচ্চারা ঠোট বাকিয়ে যেভাবে কাঁদে, মেয়েটাও তেমনি ঠোট বাকা করে সম্মতি জানালো)
প্রিয়া আজ ভীষণ খুশি। মা ডাকার জন্য একটা মা পেয়ে গেছে, যেই ছেলেটাকে মনে মনে সম্মান করতো, পছন্দ করতো তার জীবনসঙ্গী হতে যাচ্ছে।
--মা, উনি এটা জানে?
--কে?
--উনি.....
--ও বুঝেছি, না ও এখনো জানে না। ওকে বলবো।
--যদি কিছু মনে না করেন, আমি বলি?
--না না, ও তোমাকে বকা দিবে।
--কিছু বলবে না, আমার সঙ্গে আপনি আছেন তো, আপনি থাকলে কিচ্ছু বলবে না।
--আমি জানি না বাবা, যদি রেগে যায়? ও রেগে গেলে আমি কিন্তু কন্ট্রোল করতে পারি না। সাবধান,
--আচ্ছা, কাল শুক্রবার, উনি বাড়িতেই থাকবে। কাল ওনাকে বলবো।
--ঠিক আছে।
আজ প্রিয়ার ঘুম আসছে না, খুব টেনশন হচ্ছে। মামুন রাজি হবে তো? এমন মনে হচ্ছে যেনো আগামীকাল ঈঁদ। আয়েশা বেগমকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে শুয়ে আছে। প্রিয়ার খুব খুশি লাগছে আজ। এতোটা খুশি যে ও কি করছে নিজেই জানে না।
--প্রিয়া, কি হয়েছে? ভয় করছে?
--না মা, কেনো জানি আজ আমার খুব খুশি লাগছে, যা আমি বলে বোঝাতে পারবো না।
--এতো খুশি কেনো?
--এতোদিন ভাবতাম, কোনো না কোনো দিন আমাকে আপনাদের ছেড়ে চলে যেতে হবে। কিন্তু আজ তার সমাপ্তি ঘটেছে, আপনাদের ছেড়ে আমাকে আর কোথাও যেতে হবে না।
--এতো ভালোবাসো আমাদের?
--হুম, খুব।
--আমার ছেলেকে?
লজ্জায় আয়েশা বেগমের আচলের নিচে মুখ লুকালো।
--পাগলি মেয়ে। আমার সাথে কিন্তু সপ্তাহে ২-১ দিন থাকতে হবে।
--আপনি না বললেও আমি থাকবো। মায়ের ভালোবাসা পাইনি, সব এখন পুষিয়ে নিবো।
--(আয়েশা বেগম মেয়েটাকে টেনে বুকে জড়িয়ে নিলেন) পাগলি মেয়ে,,, ঘুমাও
প্রিয়ার আজ মনে হচ্ছে, এই পৃথিবীর সবচেয়ে সুখি মেয়ে সে একাই। সকালে প্রিয়ার ঘুম ভাঙার পর সবার জন্য নাস্তা বানায়, এখন পর্যন্ত কখনো সে মামুনের রুমে যায় নি। আজ প্রথম সে মামুনের জন্য চা নিয়ে এই রুমের দিকে পা বাড়ায়। চা টা টেবিলে রেখে পুরো রুমটা ভালো করে দেখে।
এই রুমটা তো তারই হবে, এই বিছানায় সে ঘুমাবে, এই মানুষটার সাথে। এই জায়গায় এটা রাখবে, ঐ জায়গায় ওটা রাখবে, সব প্ল্যান করে ফেলে।
--এই যে শুনছেন?
--..............
--এই যে (হালকা স্পর্শ করে)
প্রিয়ার যেনো বৈদ্যুতিক শক লাগে..........
এই ঘুমিয়ে থাকা মানুষটাকে আরো একবার ছোয়ার চেষ্টা করে।
তার আগেই মামুন চোখ কচলাতে কচলাতে উঠে,
--কি?
--আপনার চা.....(বলেই প্রিয়া রুম থেকে চলে আসে)
মামুন মনে মনে বলছে, মেয়েটা পাগল নয়তো? চায়ের জন্য এতো ভোরে ঘুম থেকে তুলে দেয়। আবার হঠ্যাৎ খেয়াল হলো, ও তো কখনো আমার রুমে আসে না। আজ হঠ্যাৎ....? মামুন মনে মনে হাসতে থাকে। প্রিয়া গিয়ে ব্যালকনিতে বসে আছে। ব্যালকনিতে রাখা নয়নতারার পাপড়িতে চুপটি করে বসে থাকা শিশিরে সিক্ত সকালটা আজ প্রিয়ার কাছে অন্যরকম লাগছে। হালকা ঝিরঝির বাতাস যখন বাসরলতাগুলোকে কাঁপিয়ে দিয়ে যায় তখন তার খুব ইচ্ছে করে সেই অনুভুতিটা নিতে।
কারন এই সকালটা যে প্রতিদিনের চাইতে আলাদা। আজ তার অবুঝ হৃদয় গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছে ভালোবাসা কি। একটু একটু করে নরম রোদ ছড়িয়ে পড়েছে নীল আকাশে। একইভাবে তার অবুঝ চাহনি ও মামুনের নিউরনের প্রতিটি কণায় ছড়িয়ে দিচ্ছে ভালোলাগার বার্তা। কেবল মায়ের বিশ্বাস নষ্ট হবে এই ভয়ে মামুন কখনো প্রিয়ার কাছে আসার চেষ্টাও করেনি। আজ প্রিয়া মামুনকে প্রপোজ করবে। সারাজীবন একসঙ্গে থাকার প্রতিজ্ঞা করবে।.
ব্যালকনির একটা ফুলের টপে সুন্দর একটা গোলাপ দেখা যাচ্ছে, এই গোলাপ....তুই কি পারবি আমাকে কারো জীবনে প্রবেশ করার কারন হতে? তোকে দেখে কেউ আমার দিকে ভালোবাসার হাত বাড়িয়ে দিবে, পারবি সেই ভালোবাসার সাক্ষী হতে? পারবি কি আমার হয়ে তার মুখে হাসি ফোটানোর কারন হতে? ব্যালকনির সেই গোলাপটার সাথে নিজে নিজেই কথা বলছে প্রিয়া। প্রিয়া মামুনকে বিয়ের কথা বলার জন্য ছটফট করতে থাকে।
--প্রিয়া? মামুনকে বলেছো?
--না, মা।
--আচ্ছা, আমি জিজ্ঞেস করে আসি তাহলে।
--না না, আপনি যাবেন না, আমি বলবো।
--পারবে?
--হুম পারবো, সকাল থেকে অনেক চর্চা করেছি।
--আমি সাথে আসবো?
--একটু আড়ালে থাকবেন, যদি আমাকে বকে?
--আচ্ছা চলো।
--আমি তৈরী হয়ে আসি। (বলেই দৌড়ে রুমে চলে গেলো)
একটা নীল শাড়ি পড়েছে, কপালে কালো টিপ, চোখে কাজল। যে ভাবেই হোক মামুনের মুখের উওরটা যেনো হ্যা হয়। আসার সময় ব্যালকনির সেই গোলাপটা নিলো। মামুনের রুমের সামনে আসতেই ওর বুকটা ধুকবুক ধুকবুক কাঁপতে থাকে।
--আমি আসবো?(প্রিয়া)
মামুন প্রিয়াকে দেখে অবাক হয়ে যায়,
--হ্যা আসুন।(মামুন)
আয়েশা বেগম দরজার বাহিরেই দাড়িয়ে ছিলো।
প্রিয়া গোলাপটা পিছনে রেখে ধীর গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে মামুনের দিকে।
মামুনেরও আজ একি অবস্থা, একদৃষ্টিতে প্রিয়ার দিকে তাকিয়ে আছে। কালো টিপে মেয়েটাকে ভীষণ সুন্দর লাগছে। কাজল চোখে ডুব দিতে ইচ্ছে করছে। প্রিয়াকে আজ শাড়িতে সম্পূর্ণ বাঙালি বঁধুর মতো লাগছে। মাঝে মাঝে মনে হয়, হয়তো সে কোন এক স্বপ্নের রাজ্য থেকে টুপ করে নেমে এসেছে এই ভূখন্ডে। নয়-তো সাদামেঘের রাজ্য থেকে এই শহরে এসেছে। কেনো এসেছে সে? আমায় কিছু দুঃখ দিতে? আসুক, সে যদি দুঃখ দিতে আসে, তবে সে আসুক। কিছু দুঃখ দিয়ে যাক৷ তবুও চাই সে কাছে আসুক।
--কি করছেন?(মামুনের হুস ফেরে)
--হ্যা.... গান শুনছিলাম..
--আপনাকে একটা কথা বলার জন্য এসেছি, জানিনা আপনি কিভাবে নিবেন।
মামুন যেনো আন্দাজ করতে পারছে প্রিয়া কি বলতে চাচ্ছে।
--কোনো সমস্যা নেই, বলুন।
--(প্রিয়া গোলাপটা মামুনের দিকে বাড়িয়ে দেয়।) আমি আপনাকে ভালোবেসে ফেলেছি।
এর প্রতিউত্তর কি দেবে সে?
(প্রিয়া ফুলটা নেয়ার জন্য ইশারা করে)
মামুন খেয়াল করে দরজার সামনে তার মায়ের আচল দেখা যাচ্ছে। বুঝতে পারে ওর মা দাড়িয়ে আছে। মায়ের বিশ্বাসী ছেলে, কিছুতেই মায়ের বিশ্বাস নষ্ট হতে দেওয়া যাবে না।
--কিছু বলছেন না যে?
--কি বলবো? এর কোনো জবাব আমার কাছে নেই।
--আমাকে বিয়ে করবেন?
--এর জবাবও আমার কাছে নেই। এবং আমি আপনাকে ভালোবাসতেও পারবো না।
প্রিয়ার সারাদিনের সব খুশি যেনো এক নিমিষেই মাটিতে তলিয়ে গেলো। খুব আশা ভরসা নিয়ে মামুনের কাছে এসেছিলো। সহজেই প্রিয়ার কান্না চলে আসে।
আয়েশা বেগম সাথে সাথে রুমে প্রবেশ করেন।
--কি হয়েছেরে মামুন? প্রিয়া কাঁদছে কেনো?
--কিছুনা মা, এমনিই।(মামুন)
--প্রিয়া, ও কি বলছে তোমাকে? বলো.... আজ ওর একদিন আর আমার যতোদিন লাগে।
--না মা, উনি কিছু বলেননি।(প্রিয়া)
--আমি সব শুনেছি।
--কান পাতা কিন্তু ভালো না মা,
--চুপ কর বজ্জাত, ফুলের মতো মেয়েটাকে কাঁদালি, চলো মা, তোমার বিয়ে আমি অন্য কোথাও দিবো। আমার ছেলে ভালো না।
--মা মা, কি বলছো? তুমি জানতে এই বিয়ের কথাটা?
--আমিই পাঠিয়েছি ওকে।
--আমি রাজি, আমি বিয়েতে রাজি আছি।
--তোর সাথে আর ওর বিয়েই দিবো না।
--তুমি আমার মা, ওর পক্ষ নিয়ে কথা বলছো কেনো? বললাম তো আমি রাজি
--তাহলে এখন কি বললি?
--দেখলাম তুমি দরজায় দাড়িয়ে আছো, তাই ভয়ে......
--আমাকে এতো ভয় পাশ?
--হুম, আমার মা ছাড়া আর কাউকে ভয় করিনা।
--কেন? তোর মা বাঘ নাকি ভাল্লুক?
--আমার মা আমার সব।
আয়েশা বেগম দুহাতে প্রিয়া আর মামুনকে বুকে জড়িয়ে নিলেন। এখন সবাই খুশি। মা ওদের রেখে বাহিরে চলে আসেন। প্রিয়া মামুনের দিকে কিছুটা রাগি ভাব নিয়ে তাকিয়ে আছে। মামুন ব্যাপারটা বুঝতে পারে। কান ধরে ক্ষমার দৃষ্টিতে প্রিয়ার দিকে তাকলো ওমনি প্রিয়া হেসে দেয়। এই হাসিটা মামুনের ভেতরটায় গিয়ে আঘাত করে। মজার ছলে বুকে হাত দিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ে।
--আরে, কি হয়েছে আপনার?
ওমনি প্রিয়াকে যাপটে ধরে।
--কি করছেন?
--সত্যি আমাকে ভালোবাসতে?
--(লাজুক মুখে মাথা নাড়ালো)
--হায়........... কখন থেকে?
--বলবো না, আপনিতো আমাকে ভালোবাসেন না।
--বাসি, খুব ভালেবাসি তোমাকে.... সেই ১ম দেখার পর থেকেই। বিশ্বাস নষ্ট হবে এই ভয়ে কখনো বলা হয় নি।
--আমি বিশ্বাসই করতে পারছি না আমি এই ঘরের বউ হবো।
--কার বউ হবে সেটাতো বললে না।
--(ওমনি লজ্জায় মামুনের বুকে মাথা লুকালো)
দুজনের সম্মতিতে ওদের বিয়ের দিনক্ষণ ঠিক করা হয়। প্রিয়াতো আয়েশা বেগমের কলিজার টুকরা হয়ে গেছে আচার, আচরণ, ভদ্রতা, দেখতেও মাশাল্লাহ। আর এক সপ্তাহ পর ওদের বিয়ে। এখনকার একদিন যেনো এক বছর লাগছে প্রিয়ার কাছে। একই ঘরে আছে, তবুও বিয়ের আগে কাছাকাছি হওয়া যাবে না। এটা মায়ের আদেশ।
লেখক :- আবদুল্লাহ আল মামুন

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
Give your opinion, please!