ভালোবাসার শক্তি
পর্ব:-৩
বহু প্রতিক্ষার পর আজ মামুন আর প্রিয়ার বিয়ে হলো। একটা সুন্দর ভোরের আশায় জীবনে অনেক রাতকে বিসর্জন দিয়েছে। কিন্তু আজ রাতটা যে বিসর্জন দেওয়ার মতো না। এই রাতটা জীবনে একবারই আসে। মামুন প্রিয়াকে জড়িয়ে শুয়ে আছে।
--আপনি কখনো কাউকে ভালোবেসেছিলেন?(প্রিয়া)
--সেই সুযোগ আমার জীবনে আসেনি। যেই বয়সে সবাই প্রেম করে সেই বয়স থেকে আমাকে পরিবারের হাল ধরতে হয়েছে। প্রেম ভালোবাসার দিকে কখনো নজরও দেওয়া হয় নি।
--এইজন্য আফসোস করছেন?
--হুম।
--আমি এসে গেছি, আপনার আফসোস আমি পূরন করে দেবো।
--উলে আমার বউটা, আগে কই ছিলে?
--আপনার অপেক্ষায় ছিলাম।
--আচ্ছা তোমাকে একটা প্রশ্ন করি?
--করুন
--বলোতো ১+১=কত?
--এটা কেমন প্রশ্ন? বাচ্চাদের প্রশ্ন আমাকে করছেন?
--তোমার উত্তরটা শুনি।
--২
--হয়নি,,
--কিহ? ১+১=২ হয়।
--না, ১+১=১
--এ কি আজব উত্তর,কিভাবে ১ হয়?
--১হলে তুমি + ১হলাম আমি= কত?
দুজনই হাসাহসি শুরু করে........
হঠ্যাৎই পাশের বাড়িতে হৈচৈ শুরু হয়। চারদিকের মানুষগুলো চিৎকার করতে শুরু করে। আয়েশা বেগম জানালা দিয়ে দেখার চেষ্টা করছে কি হচ্ছে। কৌতুহল বসত মামুন পাশের বাড়ির উদ্দেশ্যে বের হয়ে যায়। আয়েশা বেগম অনেক নিষেধ করে না যাওয়ার জন্য। বাসর ঘরে বউকে একা রেখে বাহিরে যাওয়াটা যে ঠিক না।
প্রিয়া ওনার সাথে এসে দাড়িয়ে আছে। মামুন পাশের বাড়িতে গিয়ে দেখে ওই বাড়ির আন্টিটা ফ্লোরে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। স্বজনরা পাশে বসে কান্না কাটি করছে। আশেপাশের লোকজনকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারে, একটা মানুষের মতো পশু মহিলাটার গলায় কামড় দিয়ে বাহিরের দিকে টানতে টানতে রাস্তায় নিয়ে আসে। রাস্তার লোকজন দেখে ধাওয়া দিলে পশুটা পালিয়ে যায়।
লোকজন ধরাধরি করে ঘরে এনে দিয়ে যায়। মামুন দ্রুত বাসায় ফিরে আসে। প্রিয়া আর আয়েশা বেগম জড়ো সড়ো হয়ে দরজার সামনে দাড়িয়ে আছে।
--কি হয়েছে ওখানে?(আয়েশা বেগম)
--ভেতরে চলো, বলছি।
দরজাটা ভালো করে আটকে দেয় মামুন।
--প্রিয়া তুমি রুমে যাও,(মামুন)
--আমি যাবো না, আমার ভয় করছে।
--আমি যেটা বলবো সেটা শুনলে আরো ভয় পাবে। তুমি রুমে যাও, আমি আসছি।
--না, আপনার সাথেই যাবো।
--ও থাকুক, কি হয়েছে বল।(আয়েশা বেগম)
--পাশের বাসার আন্টি টা মারা গেছে।
--কিভাবে?
--(মামুন পুরোটা খুলে বললো)
প্রিয়া ভয়ে কাপছে এবং ওর শাশুড়িকে শক্ত করে ধরে আছে।
--এখন থেকে কখনো দরজা খোলা রাখবে না, সব সময় ভেতর থেকে লক করে রাখবে। আমার কাছে চাবি আছে।(মামুন)
--এই জামানায় কোথায় থেকে এলো এসব জন্তু জানোয়ার? মানুষ মেরে ফেলতেছে। আল্লাহ রহম করো।(আয়েশা বেগম)
মামুন প্রিয়াকে নিয়ে রুমে এলো। প্রিয়া ভয়ে কাঁপছে। বাসর রাত পুরো মাটি হয়ে গেলো। ভয়ে মামুনকে জড়িয়ে ধরে চোখ বন্ধ করে রেখেছে। এভাবেই সারা রাত পর করলো দুজন। এর ৩দিন পর ঠিক একই ভাবে পাশের এলাকায় একজন মারা যায়। এলাকার মানুষগুলো খুবই সতর্ক হয়ে যায়, সন্ধ্যার পর এখন আর কেউ রাস্তায় বের হয় না। কিন্তু মামুনের অফিস শেষ হয় সন্ধ্যায়। এই সময়টাও কম বিপদজনক নয়। তবুও মামুন সতর্ক হয়েই বাসায় আসে। সপ্তাহ খানেক পর এলাকার আরো একজন ওই পশুর কামড়ে মারা যায়। এভাবে কয়েকদিন পর পর এলাকায় মানুষ মারা যাচ্ছে।
.
পুরো এলাকায় এই নতুন আতংক ছড়িয়ে পড়ে। এই হত্যা গুলো কেবল রাতেই হতো। এলাকায় জ্ঞানি গুনিরা মিলে এর হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য কিছু পরিকল্পনা করেন। এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ গুলো সব একত্র করা হলো। ফুটেজ দেখে পশুটার গতি বিধি নিশ্চিত করা হয়। শরীরে বড় বড় লোম, হাটার সময় মানুষের মতো হাটে, দৌড়ানোর সময় ৪ পায়ে দৌড়ায়। এক রাতে ফাঁদ পেতে পশুটাকে বন্ধি করা হয়। পশুটাকে বন্ধি করতে গিয়ে ১জন মারা যায়, এবং ১জন আহত হয়।
শরীরে কেরোসিন দিয়ে পশুটাকে জালিয়ে দেওয়া হয়। পুরো এলাকা আবার আগের মতো শান্তিপূর্ণ হয়ে ওঠে। এরপর মামুন হানিমুনে যাওয়ার প্লান করে, কিন্তু প্রিয়া আপত্তি জানায়, মাকে একা রেখে কোথাও যাবে না সে। আয়েশা বেগম ও জোর করে যাওয়ার জন্য, কোন ভাবেই প্রিয়া যেতে রাজি নয়। মুল কথা ওর বাহিরে যেতেই ভয় করে। তাই ওদের আর হানিমুনে যাওয়া হয়নি।
প্রিয়া পরিবারটা একাই সামলাতো। শাশুড়িকে কোন কাজ করতে দিতো না। ওর জান ছিলো পরিবারটা। মামুনকেও প্রচন্ড ভালোবাসতো। মামুন যেই অফিসে কাজ করে, তার পাশের একটা কারখানায় একটা শ্রমিক আরেকটা শ্রমিকের গলায় কামড় দিয়ে মেরে ফেলে। খবরটা শুনে মামুন খুবই বিস্মিত হয়, মানুষ কিভাবে আরেকটা মানুষের গলায় কামড় দিয়ে মারতে পারে?
সেই লোকটাকে পুুলিশ এরেস্ট করে নেয়। এরপর ব্যাপারটা ওখানেই ভুলে যায় সবাই। এর কয়েকদিন পর মামুন একদিন ঘরে বসে খবরের কাগজ পড়ছিলো। হঠ্যাৎ একটা শিরোনামে এসে ওর চোখ আটকে যায়।
"এক রাতেই থানা পরিনত হয় শ্মশানে"
মামুন পুরো খবরটা পড়তে থাকে।
মামুনের চোখ যেনো কপালে।
--মা,,, এদিকে এসো........
--কি হয়েছে?
--এই দেখো খবরে কি এসেছে।
--কি?
--কয়েকদিন আগে আমাদের অফিসের পাশের কারখানায় একজন আরেকজনের গলায় কামড়ে মেরে পেলে। পুলিশ ওকে ধরে নিয়ে যায়।
কাল রাতে ওই লোকটা থানার কয়েদিরা ছাড়া প্রতিটা পুলিশ, কর্মকর্তা, কর্মচারী সবাইকে খুন করে।
কয়েদিরা বলছে রাত ১২টার পর হঠ্যাৎ ঝনঝন শব্দে তাদের ঘুম ভেঙে যায়, তারা দেখে লোকটা জেল এর খাচার শক্ত রটগুলো সহজেই ভেঙে ফেলে। এরপর অন্য কয়েদিদের খাচা ভেঙে তাদের খাচায় ঢুকার চেষ্টা করে। পুলিশ বাধা দিলে একজনকে ওখানেই গলায় কামড় বসায়। সাথে সাথে ওই পুলিশ মারা যায়, কোন উপায় না পেয়ে অন্য পুুলিশ সদস্যরা বাধ্য হয়ে গুলি চালায়, কিন্তু এতে লোকটার কিছুই হচ্ছিলোনা। স্বাভাবিক ভাবে সে একে একে থানার কাউকে ছুরিকাঘাত করে কাউকে গুলি করে হত্যা করা শুরু করে। অনেকগুলো গুলি লাগার পরও সে সবাইকে মারে এবং শেষে নিজেই মরে মাটিতে পড়ে যায়।
--ইন্নালিল্লাহ, এসব কি হচ্ছে? এই কোন বিপদ?
--মা, সাবধানে থেকো, বাসায় কাউকে ঢুকতে দিও না, দরজা যেনো সবসময় লাগানো থাকে। কোন প্রতিবেশীর বাসায় যাওয়ার ও কোন প্রয়োজন নেই।
--হ্যা বাবা, তুইও সাবধানে থাকিস, কি জানি এটা কোন অজানা বিপদ।
আয়েশা বেগম খুব টেনশনে পড়ে যান। প্রিয়াকে ব্যাপারটা শুনানো যাবে না, মেয়েটা ভয় পাবে এমনিতেও আগের ভয়টা এখনো ওর কাটে নি। প্রিয়া মামুনের জন্য চা নিয়ে আসে। খবরের কাগজ নিয়ে বসলে প্রিয়ার হাতের চা যে চাই ই চাই।
--মা আপনি চা খাবেন?(প্রিয়া)
--না মা, আমার লাগবে না।
প্রিয়া হঠ্যাৎ মামুনের কাঁধে শক্ত করে হাত রাখলো।
--কি হলো?(মামুন)
--মাথাটা কেমন জানি ঘুরছে।(প্রিয়া)
--মাথা ঘুরছে? এখানে বসো। কেমন লাগছে তোমার?
--দেখি তুই সরে দাড়া, কি হয়েছে বৌমা?(আয়েশা বেগম)
--জানি না মা, হঠ্যাৎ কেমন যেনো লাগছে।
--ডাক্তারকে ফোন দেবো?(মামুন)
--তুই চুপ কর, আমি দেখতেছি। ওঠো মা...
আয়েশা বেগম প্রিয়াকে নিয়ে রুমে গেলেন।
.
যাওয়ার সময় মামুনকে বললো এখানেই থাকতে। একটু পর আয়েশা বেগম রুম থেকে বেরিয়ে এলেন।
--কি হয়েছে মা? কোন সমস্যা?
--না সমস্যা নেই।
--ও এমন করলো যে?
--যা রুমে যা....
মামুন দৌড়ে প্রিয়ার কাছে গেলো। প্রিয়া শুয়ে আছে।
--এখন কেমন লাগছে?
--ভালো
--খাওয়া দাওয়া কম করছো, তাই শরীর দূর্বল হয়ে পড়েছে।
প্রিয়া অন্য পাশ ঘুরে হাসতেছে।
--আমি সিরিয়াস কথা বলছি, আর তুমি হাসছো?
--হাসবো নাতো কি করবো? আপনি কি বোকা? কিছু বুঝেন না?
--কি বুঝবো?
--আপনি এখনো জানেন না?
--কি জানবো?
--ওরে আমার বোকা স্বামীটা রে....(গাল দুটো টেনে)
--আমি এখনো কিছু বুঝিনি, তুমি কি অভিনয় করছিলে?
--কিহ? অভিনয় করবো কেনো?
--তাহলে কিছু হয়নি, তবুও মাথা ঘুরছিলো, কেনো?
--আপনার ভাষায় আপনাকে বোঝাতে হবে।
--কি?
--১ + ১ =কত?
--১
--হুম সেটাই.....
--কিহ? সত্যি?
--হুম।
খুশিতে প্রিয়াকে নিজের বাহুডোরে আবদ্ধ করলো। এই যে এক অজানা খুশি। কাউকে প্রকাশ কারার মতো না। মেয়েটি চুপটি করে মামুনের বুকে আশ্রয় নেয়। মামুনকে এতোটা খুশি দেখে মেয়েটার চোখো পানি চলে আসে। পরিবারটাকে যে একটা উপহার দিতে চলেছে সে। এই যে খুশির কান্না,
--এই পাগলি, কাদছো কেনো?
--আমি জানি না...
--এমন খুশির খবরে কেউ কাঁদে?
--আপনার এই খুশি দেখে আমার যে নিজের প্রতি ভালোবাসা আরো বেড়ে গেলো। আমি পেরেছি আপনাকে খুশি দিতে।
--দেখো কি বলে পাগলি.... এটা শুধু আমার না, আমাদের। কিন্তু আমার আমানত....
--হুম.
আয়েশা বেগম ফ্রিজ থেকে মিষ্টি নিয়ে আসেন।
--একি? প্রিয়া কাঁদছে কেনো? তুই আবার কিছু বলেছিস?
--না মা, আমি কিছু বলিনি। কিছু হলেই শুধু আমার দোষ.....
--বেশি কথা বলিস না, নে মিষ্টি খা, মা তুমিও খাও।
--এটা কেমন আচরন? ওদিকে নরম, আর এদিকে গরম?
--এমনই হবে, পোষালে থাক, নাহলে যা......
মামুন মিষ্টি অভিমান করে ওখান থেকে চলে আসে। প্রিয়া হলো আয়েশা বেগমের চোখের মনি। খুব ভালোবাসে ওকে। আজ যেনো ভালোবাসাটা আরো বেড়ে গেলো।
--মা জানেন? উনি খুব খুশি হয়েছে?(প্রিয়া)
--বাবা হচ্ছে, খুশি তো হবেই।
--ওনার খুশি দেখে খুশিতে আমার কান্না চলে আসে।
--পাগলি মেয়ে, এই জন্য কাঁদতে হয়?
--আপনি খুশি হননি?
--দেখো মেয়ে কি বলে? আমার ঘরের চাঁদের আলো আসবে, আর আমি খুশি হবো না?
প্রিয়া শাশুড়িকে জড়িয়ে ধরে। মেয়েটা সত্যিই পাগলী......
আয়েশা বেগম প্রিয়াকে তেমন একটা কাজ করতে দেয় না, মামুনও প্রিয়ার প্রচুর খেয়াল রাখে, যত্ন নেয়। এদিকে বাহিরে আগের মতো মানুষ খুন বেড়েই চলছে। প্রিয়া এখন প্রেগন্যান্ট, এসব খবর শুনলে হয়তো ভয় পেতে পারে, তাই প্রিয়াকে এসব কিছুই জানানো হয়নি। মামুন কাজে থাকলেও মনটা সারাদিন বাড়িতে পড়ে থাকে, চারদিকে এতো বিপদ, কখন কি হয়ে যায় কোন গ্যারান্টি নেই।
বিপদগুলো হচ্ছে মানুষ দ্বারাই, হঠ্যাৎ একটা সাধারন মানুষ এরেকজনকে আক্রমন করে বসে। জিনিসটা যেনো ভাইরাসের মতো ছড়িয়ে পড়ছে। যেখানে সেখানে একজন আরেকজনকে ঘাড়ে কামড় দিয়ে মেরে ফেলছে, বা মেরে তারপর ঘারে কামড় বসাচ্ছে। এটা হচ্ছে যারা আক্রমণকারীর হাত থেকে বেঁচে যায় তারাই পরে অন্যকে আক্রমন করছে। বেঁচে যাওয়া বলতে যারা আক্রমনকারীর কামড় খেয়ে বা নখের আচড় খেয়েও বেঁচে আছে।
৩-৪ মাসের মধ্যে জিনিসটা পুরো শহরে ছড়িয়ে পড়ে। বিষয়টা যখন খবরে চলে আসে তখন প্রিয়া এটা জানতে পারে। শহরটাকে ৪দিক থেকে ঘিরে ফেলা হয়, যেনো কেউ এর বাহিরে যেতে না পারে.......
লেখক :- আবদুল্লাহ আল মামুন
লেখক :- আবদুল্লাহ আল মামুন

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
Give your opinion, please!